আমি ২০১৬ সালে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ ডেন্টাল ইউনিট থেকে বিডিএস পাশ করেছি। পাস করার পরে ইন্টার্নশিপ পিরিয়ড, যখন সবাই ক্যারিয়ার নিয়ে নানাবিধ প্লান পরিকল্পনা করছিল তখন আমার জীবনে এলো এক নতুন মোড়।ছোটবেলা থেকেই চঞ্চল আমি হঠাৎ করেই major Depressive disorder followed by OCD এর ভয়ংকর কবলে পড়ে গেলাম। ক্যারিয়ার প্লান তো অনেক দূরের কথা আমার চিরাচরিত আমিকেই আমি হারিয়ে ফেললাম। চারপাশের সবকিছুই তারপর নতুন মনে হতে লাগলো, নিজে থেকে কোন কিছু করার যে কনফিডেন্স সেটা মাইনাস লেভেলে পৌঁছে গেল। কাছের দুইজন বান্ধবী যাদের প্রতি আমি চির কৃতজ্ঞ, আমার তৎকালীন বয়ফ্রেন্ড( বর্তমান হাজবেন্ড) এবং আমার মা (আব্বুর কাছে আমার অসুস্থতার কথা গোপন করা হলো কারণ আমার আব্বু ভেতর থেকে খুবই নরম মনের একজন মানুষ ছিলেন) এই চারজন মানুষ ব্যতীত একরকম সবার কাছ থেকে পালিয়েই বেড়াতে লাগলাম।সময়ের পরিক্রমায় দুই বান্ধবীর কাছ থেকেও আলাদা হয়ে গেলাম মানে ময়মনসিং শহর ছেড়ে আমরা যার যার জায়গায় চলে গেলাম । এর মধ্যে কিছু কিছু মানুষ আমার এই অসুস্থতা নিয়ে খুবই নেগেটিভ কমেন্ট করলো, এটা কোন রোগ নয় এটা আমার বিলাসিতা আরো অনেক অনেক নেগেটিভ কমেন্ট। এই নেগেটিভ কমেন্টগুলো শোনার পর আমার মনের মধ্যে নতুন করে আরেক ধরনের অবসেশন তৈরি হলো যে আমার এগুলো মানুষ সহজভাবে নিবে না, এগুলো শেয়ার করলে সবাই আমাকে অন্য চোখে দেখবে যার কারণে আমার মা এবং আমার হাজব্যান্ড ব্যতীত আমি মাঝের ছয়টা বছর কোন ধরনের ট্রিটমেন্ট বা কাউন্সিলেই গেলাম না। মাঝে মাঝে এত হাসপাস, এত দম বন্ধ লাগতো এত অস্থির হয়ে যেতাম খালি মনে হতো আমি কেন এখানে আটকে আছি কেন আমি সবকিছু ভেঙে চুরে আমার সেই আমিতে ফিরে যেতে পাচ্ছি না। মাঝে মাঝে মনে হতো সময়ের সাথে সাথে হয়তো আমি ভালো হয়ে যাব এগুলো আবার ইগনোর করা শিখব কিন্তু না কিছুদিন পারলেও আবার সেই দারিদ্র্যের দুষ্ট চক্রের মত সবকিছু ফিরে ফিরে আসতে লাগল। আমার হাজবেন্ডের অনেক জোর জবরদস্তি পর আমি একজন সাইক্রিয়াটিস্ট স্যারকে দেখাতে রাজি হলাম কিন্তু এখানে এক নতুন বিপত্তি ঘটলো স্যার আমাকে যথেষ্ট সময় দিলেন, কথাগুলো মনোযোগ দিয়ে শোনার পর উনি বেশ কিছু ঔষধ আমাকে প্রেসক্রাইব করলেন কিন্তু ঔষধ গুলো আমি কোনভাবেই কন্টিনিউ করতে পারলাম না। এরপর আপুর মাইন্ড সেট মেন্টর এই প্লাটফর্ম টি আমার নজরে আসলো। আপু আমার মেডিকেল এরই সিনিয়র ছিলেন। আপুর প্ল্যাটফর্মে কি হতো সে সম্পর্কে আমার তখনো তেমন কোন সুস্পষ্ট ধারণা ছিল না কিন্তু আমার মেডিকেলের পরিচিত কিছু বান্ধবী, সিনিয়র আপু, জুনিয়র যারা আপুর সেশনে ছিলেন তাদের পোস্ট এবং আপুর লেখাগুলো নিয়মিত পড়ার কারণে আমি ধারণা পেলাম। আপুর একটা সেশনে আমি ভর্তি হলাম কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে ওই সেশনে আমি মাত্র দুটো ক্লাস করলাম কিন্তু দুটো ক্লাস করে আমার মনে হলো আমি যেন আশার আলো দেখতে পাচ্ছি।তাই আবার একটা সেশনে ভর্তি হলাম। এইবার আমি ডিটারমাইন্ড ছিলাম যেহেতু আমার দেওয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে, আমাকে যে কোন মূল্যে এই অবস্থা থেকে বের হতেই হবে তাই আপুর প্রত্যেকটা কথা আমি মনোযোগ দিয়ে শুনবো, প্রত্যেকটা ইন্সট্রাকশন ফলো করে সেগুলো প্র্যাকটিস করব ইনশাআল্লাহ। এই সেশন শেষে আমি যা শিখলাম তারই কিছু সারসংক্ষেপ শেয়ার করার চেষ্টা করতেছি :

১।প্রথম ক্লাসের মাধ্যমে নিজেকে লোকেট করা শিখেছি, এই পৃথিবীতে আমার অস্তিত্ব কি আমার উদ্দেশ্য কি তা নিয়ে গভীরভাবে ভাবতে শিখেছি আলহামদুলিল্লাহ।

২।আমাদের প্রত্যেকের জীবনে কিছু না কিছু unprocessed pain আছে যা আমাদের জীবনকে কুরে কুরে খাচ্ছে, আপু শিখিয়েছেন কিভাবে টাইম ট্রাভেল করে ওই unprocessed pain কে হিল করা যায়।

৩।আমরা অনেকেই নিজেকে ক্ষমা করতে পারি না কিন্তু আপু শিখিয়েছেন কিভাবে সবকিছুর আগে নিজেকে ক্ষমা করতে হবে।

৪।কাউকে সাহায্য করতে পারা আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের পক্ষ থেকে একটা ব্লেসিং, কিন্তু আমাদের সকলেরই জীবনে এই সাহায্য করা নিয়ে তিক্ত অভিজ্ঞতা রয়েছে। আলহামদুলিল্লাহ আপুর কাছ থেকে শিখতে পেরেছি কিভাবে নিজের বাউন্ডারি সেট করতে হবে, কেউ সাহায্য চাইলে সেখানে কিভাবে wisely decision নিতে হবে।

৫।আপুর কাছ থেকেই প্রথম জানতে পেরেছি যে অভিমান একটা বিষ বৃক্ষের মত যে গাছ কোনদিন আমাকে ফল দিবে না, অন্যের কটু কথা কিভাবে হজম করতে হবে,ইগনোর করতে হবে আপু তা চমৎকারভাবে শিখিয়ে দিয়েছেন।

৬।চমৎকার কিছু টারম যেমন, emotional fool,emotional intelligence, mindfullness,positive law of attraction,negative law of attraction, তাকওয়া, ইস্তেগফার এগুলো শুনেছিলাম কিন্তু এগুলোর তাৎপর্য গভীরভাবে কেউ শেখাননি যা আপুর মাধ্যমে শিখতে পেরেছি আলহামদুলিল্লাহ।

কারা আসবেন এই চিওভূমিতে???
আমার অনুভূতি থেকে আমি এটা লিখছি যারা দীর্ঘদিন থেকে আমার মত মানসিক যন্ত্রণায় ভুগছেন, ছটফট করছেন, হাসফাঁস করছেন, কাকে বলবেন, বললে কি হতে পারে এই দ্বিধাদ্বন্দ্বে নিজের মধ্যেই সব কিছু চেপে রাখছেন, মাঝে মাঝেই মনে হচ্ছে আর বুঝি সম্ভব না প্লিজ তারা আসুন একবার এই চিওভূমিতে। বিশ্বাস করুন এখানে আসার পর আপনার নিজেকে একা মনে হবে না,আপনার এটা মনে হবে না এই পৃথিবীতে আমি বুঝি একাই এরকম সমস্যার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি, অনেকের সাথে আপনার অনেক কিছু মিলে যাবে, অনেকের অনেক প্রশ্নের মাধ্যমে আপনার নিজেরও অনেক সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে ইনশাআল্লাহ।

পোস্টটি দীর্ঘায়িত হওয়ার জন্য আমি খুবই দুঃখিত আসলে এত অনুভূতি যাকে কিছু শব্দে, কিছু বাক্যে ধারণ করা আমার জন্য সত্যিই কষ্টের। স্বর্ণা আপুর জন্য মন থেকে অনেক অনেক দোয়া, অবলীলায় দোয়াগুলো চলে আসে ভিতর থেকে, আপু আপনার এই চিত্ত ভূমির যাত্রা অনেক অনেক দীর্ঘায়িত হোক, অনেকের জীবনের অনেক জটিলতম সমস্যা সমাধানের দূত হিসেবে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আপনাকে নিযুক্ত করুন, আমিন।

সবার জন্য ছোট্ট একটি মেসেজ বলতে পারেন যা আপুর এই সেশন এর পাশাপাশি আমার ভেতর কে নাড়িয়ে দিয়েছে, এটা আমার এক প্রিয় স্যারের উক্তি
“জন্মগতভাবে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আমাদের প্রত্যেকের ভিতরে কিছু আলো দিয়ে থাকে যে আলো দিয়ে আমার নিজেকে আলোকিত করতে হবে, আমার চারপাশ কে আলোকিত করতে হবে, সে আলোর ডানায় ভর করে দেশ বিদেশ বিচরণ করতে হবে। “

বিশেষ দ্রষ্টব্য :এই যে আজকে নিজের নাম প্রকাশ করে নিজের অনুভূতি ব্যক্ত করতে পারতেছি এইটা চিত্তভূমির এই সেশনের সার্থকতা এবং আমার কাছে সর্বোত্তম উপহার।